শুক্রবার, ১৯ জুলাই, ২০২৪, ৪ শ্রাবণ, ১৪৩১

উৎসব, সংস্কৃতি ও সামাজিকতা

ওয়ারেছা খানম প্রীতি

আচ্ছা বলুন তো, জীবন থেকে কতগুলো উৎসব জাস্ট হাপিস হয়ে গেছে তা কি আপনারা মনে করতে পারেন? আমি জানি আপনারা গণনা শুরু করেছেন। মন খারাপ হচ্ছে তাই না! স্লো পয়জনিং মারাত্মক জিনিস। ক্ষতস্থান একদিনে আক্রান্ত হয়নি। একদিনে পচেও যায়নি। মাঝখান থেকে হারিয়েছি আনন্দ, হারিয়েছি সত্তা, হারিয়েছি আগামী। আহা কয়দিন পর একটা প্রজন্ম হয়তো জানবে না আমাদের হালুয়া রুটিরও একটা উপলক্ষ ছিল। পাড়াময় হালুয়া রুটি বিতরণ রীতিমতো একটা উৎসবে রূপ নিতো।
নিরেট আরও কিছু সামাজিক উৎসবকে আমরা বিধিনিষেধের জালে আটকে ফেলেছি। বুদ্ধদেব গুহ’র মতো করে বলতে ইচ্ছে করে—‘সুখ নেইকো মনে নাকছাবিটি হারিয়ে গেছে হলুদ বনে বনে।’
১১ এপ্রিল ২০২৪ ঈদ। ঈদ উদযাপনের দুইদিন পরে ১৪ এপ্রিল ২০২৪ বাংলা নববর্ষ। একটি ধর্মীয়, আরেকটি বাঙালির সাংস্কৃতিক উৎসব। দুটোই একসময় ছিল অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের জাতীয় উৎসব। ঈদ পার্বণে সেমাই শুধু আমরা খাইনি। আমাদের কাছে ঈদের উল্লেখযোগ্য আনন্দই ছিল ভিন্নধর্মাবলম্বী বন্ধুদের সেমাই খাইয়ে, ঠিক ততটাই আনন্দ ছিল সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পূজার নাড়ুতে, পাচনে এবং ততধিক আনন্দ ছিল প্রবারণা পূর্ণিমায় একসাথে ফানুস উড়িয়ে। কতটুকু বদলেছি আমরা?
এর কোনো পরিসংখ্যানই নেই। কিংবা আসলেই কি বদলেছি! কাঠামোগত যেকোনো পরিবর্তন দুইভাবে সম্পন্ন হয়। হয় শক্তিশালী কারও মাধ্যমে অবস্থান দৃঢ় হয়, নয়তো শক্তিশালী কারও মাধ্যমে আত্মবিশ্বাসের জায়গা নড়বড়ে হয়। ওজনে যে ভারি হবে শেষমেশ সে-ই জিতে যায়।
দুইটি ঘটনার কথা বলি। রিলের সাথে তো আমরা প্রায় সবাই পরিচিত। ফেসবুক রিলের কথা বলছি। আমরা নিজেদের প্রিয় মুহূর্তগুলো ফেসবুকে রিল আকারে প্রতিনিয়ত শেয়ার করি। অবসরে স্ক্রল করতে করতে দেশ বিদেশের রিল থেকেও তথ্য সমৃদ্ধ হই।
এমনই একটা রিলে একদিন চোখ আটকালো। লেবার রুমের বাইরে আত্মীয় পরিজনবেষ্টিত নরনারী, উৎকণ্ঠায় চারপাশে পিনপতন নীরবতা। জায়গাটা সৌদি আরবের একটা হাসপাতাল। একসময় লেবার রুম থেকে একটা কাপড় জড়িয়ে সদ্যজাত শিশুকে বাইরে নিয়ে আসলেন নার্স। আনন্দের আতিশয্যে উপস্থিত নারীরা একযোগে উলুধ্বনি দিয়ে শিশুটিকে বরণ করলেন ও শুভাশিস জানালেন।
পরের ঘটনাটা কোনো রিল নয়। মাত্র কয়দিন আগের। ঢাকার মেয়ে ও মিশরের ছেলের মধ্যে হৃদ্যতা তৈরি হয়, এরপর তারা পারিবারিক সম্মতিতে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেয়। বিয়ে অনুষ্ঠিত হয় ঢাকায়। উপস্থিত মিশরীয় আত্মীয়পরিজন তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ধারায় সেই বিয়েকে আনন্দমুখর করে তোলে। মিশরীয় আত্মীয়দের আনন্দের বহিঃপ্রকাশ ছিল উলুধ্বনি। দেশ, কাল ও স্থান ভেদে সংস্কৃতি আলাদা হতে পারে কিন্তু এর ব্যবহারিক উদ্দেশ্য এক। ধর্ম ও সংস্কৃতি পরস্পর সমান্তরাল, কখনোই সাংঘর্ষিক নয়।
ওপরের দুটো উদাহরণ পারতপক্ষে বাংলাদেশে বসে কেউ বিশ্বাস করতে পারবেন না। কারণ কী জানেন? সমাজে কোনো না কোনোভাবে একটা গ্যাপ তৈরি হয়েছে। সেই গ্যাপে ঢুকে পড়েছে কু-শিক্ষা, অজ্ঞতা, সংস্কৃতির প্রতি বিদ্বেষ ও ধর্মের বহুল অপপ্রচার। এই বাংলায় এটা ছিল না কখনো। আঞ্চলিক সংস্কৃতি, প্রচলিত লোকাচার বা লোকায়ত সংস্কৃতি যেকোনো দেশের নিজস্ব সম্পদ। সেই সংস্কৃতি হতে পারে ধর্ম উৎসারিত, আবার নাও হতে পারে।
বাংলার হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, নৃগোষ্ঠী সব সম্প্রদায়ের মানুষ মিলেই একটা জাতি; বাঙালি জাতি। আর সব ধর্মাবলম্বীর নিজস্ব সংস্কৃতি মিলে তবেই বাঙালি সংস্কৃতি। এইটাই বিশ্বাস করে এসেছে বাংলার মানুষ। সংস্কৃতির উচ্ছ্বাস, মঙ্গল কামনা কিংবা শুভাশিস কখনো কখনো শব্দ দ্বারা নিরূপিত হয়। তা ধর্ম ও জাত পাতের ঊর্ধ্বে একেবারে প্রাণ থেকে নিঃসরিত। উলুধ্বনি তেমনই হৃদয় উচ্ছ্বসিত একটি সাংস্কৃতিক আচার। আরোপিত কিছু নয়।
খুব বেশিদিন আগের ঘটনা তো না যখন একজন বাঙালি মুসলিম নারীর বিয়ের ধরন ছিল অন্যরকম। বৃহত্তর সাংস্কৃতিক বলয়ে প্রায়শই আচরণ বিধির সংযোজন বিয়োজন ঘটতে পারে। কিন্তু তাই বলে বিরুদ্ধ মতকে বাতিল ঘোষণা করা, অবমূল্যায়ন করা কিংবা অন্য সংস্কৃতিকে বিদ্রূপ করা এবং পারলে নাকচ করে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। যেই সংস্কৃতিটা কয়েক বছরে গড়ে উঠেছে। শুনলে অবাক হবেন বেশিরভাগ মুসলিম প্রধান রাষ্ট্রে সংস্কৃতি ও ধর্ম এই দুটোকে আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা হয়। যে যার জায়গায় সম্মানের সাথে অটুট থাকবে।
বাংলাদেশের এখনকার যে প্রেক্ষিত তাতে আমরা কি ভাবতে পারি ইন্দোনেশিয়ার মতো মুসলিম রাষ্ট্রের জাতীয় গ্রন্থ রামায়ণ এবং তাদের জাতীয় প্রতীক গরুড় যেটা কি না সনাতন ধর্মাবলম্বী দেবতা বিষ্ণুর বাহন! তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য তাদের জাতি ধর্মের ঊর্ধ্বে। বিষয়গুলো হয়তো আমরা কেউই জানি না, না জেনে না বুঝে শুধু লম্ফঝম্ফ করি।
বাংলা নববর্ষের পাশাপাশি বিজু, সাংগ্রাই, বৈসু, নবান্ন, পৌষ সংক্রান্তি, বসন্ত উৎসব, বর্ষা উৎসব সবই বাঙালির জাতিসত্তার উৎসব। আছে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের আরও অসংখ্য জাতীয় উৎসব। নির্বিঘ্নভাবে যার যার উৎসব পালন করার পূর্ণাঙ্গ অধিকার আছে। আর অসাম্প্রদায়িক যারা সব উৎসবে একাত্ম হয়ে অংশগ্রহণ করতে ইচ্ছুক, নির্বিঘ্ন অধিকার আছে তাদেরও।
লেখক : প্রেসিডেন্ট, হার ই-ট্রেড
Join Manab Kallyan