বুধবার, ১৭ এপ্রিল, ২০২৪, ৪ বৈশাখ, ১৪৩১
প্রচ্ছদ মতামত বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, বিচ্ছেদ এবং সামাজিক অস্থিরতা

বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, বিচ্ছেদ এবং সামাজিক অস্থিরতা

-অলোক আচার্য

আমাদের সমাজের সর্বত্র আজ ব্যাধিগ্রস্থ। নানাভাবে এই সমাজকে চারদিক থেকে সমস্যাগ্রস্থ করে তুলছে কিছু সাধারণ সমস্যা। প্রতিদিন এই চিত্র আমাদের দেখতে হচ্ছে। সমাজ কীভাবে চলবে বা কোনপথে অগ্রসর হবে, তা ইতিবাচক না নেতিবাচক হবে তা সেই সমাজের বসবাসরত মানুষের ওপর নির্ভর করে। এই ব্যাধিগ্রস্থ সমাজের একটি আধুনিক সমস্যা হলো পরকীয়া। এই সমস্যা হয়তো আপাত দৃষ্টিতে ততটা প্রকট মনে হবে না কারণ এর থেকেও আরো বড় বড় সমস্যা রয়েছে যা দৃশ্যমান এবং প্রতিনিয়তই দগ্ধ  করছে আমাদের। কিন্তু পরকীয়ার জের বা পরিণতি আমরা দেখছি মাঝে মাঝেই। পরকীয়ার জেরে ঘর ভাঙছে। ঘর ভাঙার ফলে সমাজে বিশৃঙ্খলা ঘটছে।
একটি সুতোয় গাঁথা শৃঙ্খলায়িত সমাজ ব্যবস্থা যার কোনোটিতে টান পরলে নড়বড়ে হয়ে ওঠে গোটা সমাজ ব্যবস্থা। পারিবারিক অশান্তির মূলে রয়েছে পরকীয়া সম্পর্ক। পারিবারিক অশান্তি পারিবারিক থাকছে না। তা নোংরা বা দূষণের মতো সমাজকে দূষিত করে চলেছে। সম্পর্ক বস্তুত এমন শব্দ যা নির্ভর করে বিশ্বাসের ওপর যা আমাদের সমাজে বিরল একটি বস্তু। একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে বিশ্বাস করবে। মানুষ হিসেবে এটিই স্বাভাবিক। এটিই হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু সেটি হচ্ছে না। সব জায়গাতেই ভাঙনের সুর বাজছে। নদীতে যে ভাঙন সৃষ্টি হয়, তা কোনোভাবে আমরা ঠেকাতে পারছি। কিন্তু আমাদের সমাজের সর্বত্র যে ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে তা থেকে পরিত্রাণের উপায় জানা নেই কারো। আর জানা থাকলেও তা আজ প্রয়োগ করা কষ্টসাধ্য। কারণ সমাজের গোড়া থেকে যে ব্যবধান গড়ে উঠছে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সেই ব্যবধান কেবল বাড়ছে-বৈ কমছে না। পিতা-মাতার সঙ্গে সন্তানের ব্যবধান, অমানবিকতার সঙ্গে মনুষ্যত্বের ব্যবধান। ওই যে আমাদের আস্থার সংকট রয়েছে। ঘর ভাঙছে। ঘর ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে সমাজটাও ভাঙছে। প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় ছেলে মেয়ে স্বামী সংসার ছেড়ে প্রেমিকের বাড়ির সামনে বিয়ের দাবিতে কেউ ধরনা দিচ্ছে। হায়রে পঁচে যাওয়া সমাজ। যার কোনো দায় কেউ নেয় না। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) নতুন এক জরিপ প্রতিবেদন বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস-২০২২ এ উঠে এসেছে দেশে বিয়ের হার বেড়েছে। বেড়েছে তালাক বা বিবাহবিচ্ছেদও। আর বিবাহবিচ্ছেদের সবচেয়ে বড় কারণ বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক এবং দাম্পত্যজীবন পালনে অক্ষমতা (বনিবনার অভাব)। ২০২২ সালে সাধারণ বিয়ের হার পাওয়া গেছে ২৫-এর কিছু বেশি। ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রতি এক হাজার মানুষের মধ্যে ওই বছর যত জনের বিয়ে হয়েছে, সেটি সাধারণ বিয়ের হার। এই হার ২০২১ সালে ছিল ১৮ দশমিক পাঁচ। বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের কারণে সবচেয়ে বেশি বিচ্ছেদ হয়েছে ঢাকা বিভাগে, কম ময়মনসিংহ বিভাগে। দাম্পত্যজীবন পালনে অক্ষমতায় বিবাহবিচ্ছেদ বেশি বরিশালে, কম সিলেটে। ভরণপোষণ দিতে অসমর্থতার কারণে বিবাহবিচ্ছেদ বেশি রাজশাহীতে, কম চট্টগ্রামে। দেখা যায়, ২০২১ সালে নারীদের সাধারণ বিবাহবিচ্ছেদের হার ছিল দুইয়ের সামান্য কম। সেটি পরের বছর বেড়ে তিন দশমিক ছয়ে দাঁড়ায়। একইভাবে পুরুষের ক্ষেত্রে হারটি ২০২১ সালে ছিল দুইয়ের সামান্য বেশি। পরের বছর তা বেড়ে তিন দশমিক আটে দাঁড়ায়। বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রে বড় কারণ বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক। এই যে পরকীয়া বা বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক সেটি আজ সমাজ ধ্বংসের অন্যতম কারণও বটে।
বিয়ে একটি শক্তিশালী বন্ধন হিসেবে আদিকাল থেকে আমাদের সমাজে প্রবাহমান। সেই বন্ধন আজ যেন কমতে শুরু করেছে। স্বামী তার প্রিয়তমা স্ত্রীকে বিশ্বাস করতে পারছে না অন্যদিকে স্ত্রীও তার স্বামীকে বিশ^াস করতে পারছে না। পৃথিবীর পবিত্রতম একটি সম্পর্কে ফাটল ধরার চিত্র আজ সর্বত্র। সম্পর্কে থাকছে না কোনো পরিতৃপ্তি। এক ধরনের অপ্রাপ্তি হাহাকার ক্রমেই সংসারে দানা বাঁধছে। একটি পরকীয়া শব্দটির সাথে প্রেম শব্দটি যোগ করলেও আমার মনে হয় প্রেমের মতো পবিত্র একটি শব্দ পরকীয়ার সঙ্গে যোগ করা যায় না। এত নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটছে এই পরকীয়া ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে সমাজের এই দিকটা আমাদের ভাবতে বাধ্য করছে। কেন হচ্ছে এসব? স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মাঝে বিশ্বাসহীনতা কেন জন্ম নেবে? সম্পর্কের অবনতি ঘটার ক্ষেত্রে কেউ এককভাবে দায়ী নয়। কোথাও পুরুষ আবার কোথাও নারী এর জন্য দায়ী। আসলে যখন বিয়ের মাধ্যমে একটি সংসার শুরু হয় তখন দু’জন দু’জনের প্রতি সম্মান, বিশ্বাস এবং ভালোবাসা থাকা আবশ্যক। সেটি যাতে যাত্রার মাঝপথে তাড়িত না হয়, অবনতি না হয় সেজন্য উভয়কেই হাত ধরাধরি করে সমাধান করতে হয়। যেকোনো কারণেই স্বামী স্ত্রীর সাথে মনমালিন্য ঘটতে পারে। কিন্তু সেটি সমাধানের দায়িত্ব নিজেদের হাতে রয়েছে। সম্পর্কের পরিতৃপ্তি বলে বিষয়টি রয়েছে তা কেবল চাহিদার ওপর নির্ভর করে না। করে ভালোবাসার ওপর। বিচ্ছেদ খুব সহজ একটি বিষয়ে পরিণত হয়েছে। কিন্তু বাস্তবিকপক্ষে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব যে কতটা ক্ষতিকর তা আজ আমরা বুঝতে পারছি। পরকীয়ায় আসক্ত হওয়ার ফলে তা কেবল বিচ্ছেদের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। অপরাধ প্রবণতা বা অপরাধের মধ্যে দিয়ে তার সমাপ্তি ঘটছে। এটি প্রথমেই অনুধাবন করতে পারছে না বেশিরভাগই। তবে যখন তা পারছে তখন আর সময় থাকছে না। আবার এই রাস্তা থেকে যে ফিরে আসছে না তা নয়। ফিরেও আসছে। তবে সে সংখ্যা যেন কমছে।
নিজের ভুল বুঝতে পারা, নিজের কমিটমেন্ট বা প্রতিজ্ঞা যা একজন স্বামী তার স্ত্রীকে দেয় বা স্ত্রী তার স্বামীর কাছে করে সেই কমিটমেন্টের সম্মান রাখা জরুরি। একজনের অনুপস্থিতিতে অন্যজনকে কোনো সুযোগ নয় বরং তা অন্যজনের জন্য এক মায়ায় আবদ্ধ রাখবে। যার প্রভাবে সে কোনো ধরনের অবৈধ সঙ্গে না জড়ায়। একটি পরিবারে আজ স্বামী-স্ত্রী দু’জনই চাকরি করছে। এখানে অবিশ্বাস নয়, সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে পারে বিশ্বাস। অর্থাৎ বিশ্বাসই সম্পর্কের মূল ভিত্তি। তবে সেই বিশ্বাসের সুযোগ নেওয়ার প্রবণতা আজ আমাদের ভেতর প্রবল হয়ে উঠেছে। বিশ্বাসের দৃঢ়তা কমার জন্যই আজ সন্দেহ সেখান দিয়ে প্রবেশ করেছে। একবার যখন সন্দেহ দানা বাঁধছে মনে তখন তা আরো গভীরভাবে প্রভাব ফেলছে মনে। সেই সন্দেহ থেকে বেরিয়ে আসা অত্যন্ত কঠিন কাজ। আবার এতটাও কঠিন নয়। শুধু বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করা এবং সন্দেহের বিষয়টি আলোচনা করা। একে অপরের ভালো বন্ধু হিসেবে এটি সহজেই করা যায়। এক্ষেত্রে মিথ্যার আশ্রয় নেওয়া উচিত নয়। সত্য বচনে অনায়াসেই সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব। সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব উভয়েরই। দেখা গেছে, পরকীয়ার ঘটনায় যারা জড়িয়ে পরছে এবং পরবর্তীতে নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছে- তাদের সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভাবেনি। মা বাবার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো তার সন্তান। যখন কোনো ক্রাইম বা অপরাধ ঘটছে তখন সেই সংসার এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। আবার অপরাধ না ঘটলেও সংসার একত্রে থাকছে না। বিচ্ছিন্ন হয়ে পরছে সন্তান। অথচ সেই ছেলে বা মেয়ের দোষ কোথায়? মা-বাবার কাছে তাদের দাবী ছিল বড় হয়ে ওঠার একটি সুষ্ঠু পরিবেশ। কিন্তু সেই পরিবেশ তারা পাচ্ছে না। পরবর্তীতে দেখা যায় সেই ঘটনা থেকে তার বেরিয়ে আসতে পারছে না। সেটি অনেক কঠিন একটি সময়।
সমাজ কীভাবে চলবে তা মানুষ নির্ধারণ করবে। কেবল যে ঘটনাগুলো আমরা জানতে পারছি সেগুলোই চোখে আসছে। যেসব আমাদের অন্তরালে রয়েছে সেই অন্তরালের ঘটনাগুলো সংসারে অশান্তি সৃষ্টি করছে। প্রতিদিন অশান্তির কারণে বড় কোনো সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। একটি সমস্যা আরো একাধিক সমস্যাকে জন্ম দেয়। একটি মিথ্যা যেমন আরো হাজার মিথ্যার জন্ম দেয়-ঠিক সেরকমই। পরকীয়ায় সম্পর্কে জড়ানোর পর এরকম বহু মিথ্যা বলতে হয়। একটি মিথ্যা বলতে গিয়ে আরো হাজার মিথ্যা সাজাতে হচ্ছে। মিথ্যার ভিত্তি হয় খুব দুর্বল। ফলে একদিন তা প্রকাশ্যে এসে পাহাড় সমান বিপদের কারণ হচ্ছে। আমাদের এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে হবে। আর পরিত্রাণ পেতে হলে প্রথমেই সম্পর্ককে মজবুত করতে হবে। একটি মজবুত ঘর যেমন খুব সহজেই ভেঙে পরার আশঙ্কা থাকে না, তেমনি একটি মজবুত সম্পর্কও সহজে ভেঙে পরে না। একসঙ্গে চলতে গিয়ে কোনো সমস্যা আসতেই পারে। আসুক সমস্যা। তা সমাধানের পথ বের করতে হবে উভয়ে মিলে। সেই সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে আর নতুন কোনো সমস্যার ভেতর প্রবেশ করলে তা আরো বেশি কঠিন হয়ে সামনে আসবে। একসময় এ ধরনের অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে নানা অপরাধে জড়িয়ে পরছে। সমাজের শৃঙ্খলা নষ্ট হচ্ছে। যে সমাজ ব্যবস্থা আমাদের গর্ব সেই সমাজ ব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে। আরো নানা সামাজিক সমস্যার মতোই পরকীয়া সম্পর্ক একটি বড় সমস্যায় পরিণত হয়েছে। কেন হচ্ছে বা কেন এ ধরনের সম্পর্কে জড়াচ্ছে তার সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ নেই। এ থেকে আমাদের বের হতে হবে। সমাজের শুদ্ধতায়, বিশ্বস্ততায় এবং শৃঙ্খলাপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠায় এই অবৈধ সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতেই হবে।

অলোক আচার্য : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

Join Manab Kallyan

সর্বোচ্চ পঠিত