বুধবার, ১৭ এপ্রিল, ২০২৪, ৪ বৈশাখ, ১৪৩১
প্রচ্ছদ মতামত যেসব অভ্যাসের কারণে আপনি আরও গরীব হচ্ছেন

যেসব অভ্যাসের কারণে আপনি আরও গরীব হচ্ছেন

আমাদের মধ্যে কেউ কেউ জন্মগতভাবে গরীব থাকেন, আবার কেউ কেউ জন্মগতভাবেই ধনী হন। অনেকে বলছেন যে, গরীব হিসেবে জন্ম নেওয়াটা দোষের নয় কিন্তু মারা যাওয়ার সময় যদি আপনি দরিদ্র বা গরীব থাকেন সেটা আপনার দোষ। কারণ, আপনি সারাজীবন আর্থিকভাবে সফল হওয়ার জন্যে, স্বাধীন হওয়ার জন্যে, ঠিক মতো কাজ করেননি।

আমরা কেউ কেউ মনে করি যে, আল্লাহ আমাদেরকে গরীব রেখেছেন। আবার কেউ কেউ ভাবেন যে তাঁদের ভাগ্যই খারাপ। আমি কোনো কথাকে গ্রহণ বা পরিত্যাগ করছি না, এখানে কিছু কথা যোগ করছি। ভাগ্য বলে একটা কথা আছে, আমরা জানি। কিন্তু আপনি যদি কাজ না করে বসে থাকেন, তাহলে ভাগ্য সুপ্রসন্ন হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আপনি কাজ করবেন, পরিশ্রম করবেন, তাঁর সাথে আপনার ভাগ্য যোগ হবে। আপনি ধনী হবেন, আপনি আপনার পেশায় সফল হবেন।

আপনার খরচের পর যা থাকবে তা সঞ্চয় করবেন না বরং সঞ্চয়ের পর যা থাকবে তাই খরচ করবেন। যারা এটা করেন না এবং খরচের সঠিক পরিকল্পনা করেন না, তাঁরা আয় এবং ব্যয়ের সাথে সামঞ্জস্য রাখতে পারেন না। দেখবেন যে, অনেকের কাছে রিটায়েরমেণ্টের পরে পর্যাপ্ত টাকা থাকে। আবার অনেকের অনেক ঋণ থাকে। এটা মূলত আয়ের উপর নির্ভর করে না, এটা নির্ভর করে ব্যক্তির খরচের অভ্যাসের উপরে এবং ফান্ড ম্যানেজমেন্টের দক্ষতার উপর।

কী কী অভ্যাসের কারণে মূলত আপনি গরীব থেকে আরো গরীব হচ্ছেন, আপনি হয়তো জানেন অথবা জানেন না। যারা প্রতিদিন একটু একটু করে গরীব হচ্ছেন, তাঁদেরকে উদ্দেশ্য করে, তাঁদের খেয়াল করার জন্য আমরা কয়েকটি পয়েন্ট নিয়ে আলোচনা করছি। এই আলোচনায় সূক্ষ্মভাবে দৃষ্টি দিলে আপনি দেখবেন যে, এই পয়েন্টগুলো আপনি সঠিকভাবে অনুসরণ করছেন না। অনুসরণ করলে আপনি ধীরে ধীরে ওয়েলদি হয়ে উঠতেন।

এক.
পরিকল্পনাহীনতা। দেখবেন যে, আপনি ইনকাম করছেন, খরচ করছেন, আপনার সময় চলে যাচ্ছে, বাচ্চারা বড় হচ্ছে, আপনার বয়স হচ্ছে, আপনি বুড়ো হচ্ছেন কিন্তু আপনার কোনো ধরনের কোনো আর্থিক পরিকল্পনা নেই। সময়ের সাথে সাথে যেগুলো সামনে আসছে শুধু সেগুলো মিট করতে করতে আপনি সামনে যাচ্ছেন। আপনি পাঁচ বছর পরে নিজেকে কোন অবস্থায় দেখতে চান? আপনার বাচ্চাকে ভবিষ্যতে কি ধরনের এডুকেশন দিতে চান? আপনি রিটায়ারমেন্টের পরে কি করতে চান? আপনি দশ বছর পরে কি আর্থিক অবস্থায় নিজেকে দেখতে চান- এগুলোর ব্যাপারে কোনো চিন্তাভাবনা আপনার নেই। সবকিছু ভাগ্যের হাতে সমর্পণ করা। এই যদি অবস্থা হয় তাহলে আপনি আর্থিকভাবে স্বাধীন হতে পারবেন না, আপনি দরিদ্র থেকে যাবেন। কারণ আপনি শুধু আয় করবেন আর ব্যয় করবেন।

দুই.
নিডস এবং ওয়ান্টস- এই দুটো বিষয়ের মধ্যে পার্থক্য না করা। আমরা অধিকাংশ সময় যেটা করি সেটা হচ্ছে, আমাদের সামনে যে প্রয়োজন চলে আসে, সেই প্রয়োজনীয়তাকে মিট করে সামনে এগিয়ে যাই। কিন্তু আমরা ভেবে দেখি না যে, এটা আমার নিডস নাকি ওয়ান্টস। নিডস যেটা সেটা আপনার না হলে চলবে না। ওয়াণ্টস যেটা সেটা আপনার না হলেও চলে। (যদিও সেটা আপনার জীবনে কিছু ভ্যালু যোগ করে।) জীবন চালানোর জন্য যখন আপনি খরচ করছেন, তখন দেখবেন যে মনের অজান্তেই আপনি ওয়াণ্টসের প্রতি বেশি মনোযোগী হচ্ছেন। ধরুন, আপনার জামা আছে পাঁচটা, আপনার আরও দুটো কিনলে ভালো লাগবে। আপনার ঘড়ি আছে একটা, একটু পুরানো হয়ে গেছে, আর একটা নতুন ঘড়ি হলে ভালো লাগবে। টেলিভিশনটা একটু পুরনো, একটু বড় স্ক্রিনের একটা টিভি হলে আপনার ভালো লাগবে। আপনার বাসাটা একটু কম চকচক করছে। এটা যদি ভালো করে ইন্টেরিয়র করা যায় তাহলে ভাল লাগবে। এরকম অনেকগুলো বিষয় আছে, যে বিষয়গুলো অ্যাভয়েড করলে আপনি চলতে পারবেন। কিন্তু আপনার হাতে টাকা আসলেই আপনি সেগুলো খরচ করে ফেলেন। মানে আপনি নিডস আর ওয়ান্টসের মধ্যে পার্থক্যটা সঠিকভাবে করেন না। আপনাকে এই দুটোর মধ্যে একটা পার্থক্য করতে হবে এবং আপনাকে নিডস-এ ফোকাস করতে হবে। আপনি ওয়ান্টসে কম ফোকাস করবেন।

তিন.
একটি আয়ের উৎসের উপর নির্ভর করা। দেখবেন, যারা নিম্ন মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত বা গরীবশ্রেণির মানুষ তাঁরা শুধু একটা আয়-উৎসের উপর নির্ভর করে। তাঁরা হয়তো একটা চাকরি করে, কিন্তু তাঁদের যে দক্ষতা সেটাকে কাজে লাগিয়ে বা দক্ষতাকে উন্নত করে বা অন্য একটা স্কিল ডেভেলপ করে, আরও যে বাড়তি ইনকাম করার সুযোগ রয়েছে, তাঁরা সেই দিকে খেয়াল করেন না। ফলে একটা ইনকামের পরে যখন আপনি নির্ভর করবেন তখন ইনফ্লেশনের ইফেক্ট বা অন্যান্য তাৎক্ষণিক বিভিন্ন প্রয়োজনীয়তার কারণে আপনার উপরে প্রেসার অনেক বেশি পড়বে এবং সেভিংসের প্রতি আপনার নজর কমে যাবে। আপনার চেষ্টা করা দরকার একের অধিক ইনকাম সোর্স তৈরি করার। যারা সেটা করেন না, তাঁরা গরীব থেকে আরো গরীব হন।

চার.
শর্টকাট পন্থা অবলম্বন করা। আমাদের সবার চারপাশে অনেক মানুষ আছে, যারা টাকাপয়সা আয়ের জন্য খুব সহজ কোনো রাস্তার খোঁজ করেন। কিন্তু সত্যি কথা বলতে কি, জীবনে সফল হওয়ার জন্য বা টাকা পয়সা আয় করার জন্য শর্টকাট কোনো পথ নেই। আমার পরিচিত এক ভদ্রলোক আছেন, অনেক টাকা আয় করেন কিন্তু উনি জুয়া খেলেন। ফলে যে ইনকাম তিনি করেন, হাতের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যায়। জুয়াতে মাঝে মাঝে হঠাৎ করে তার অনেক লাভ হয়ে যায়। এই যে লোভ এই লোভ তাকে অন্য কাজে মনোযোগ দেওয়া থেকে, অন্য ইনকাম বাড়ানোর পথ থেকে দূরে রাখে। এবং সে প্রতিনিয়ত জুয়ায় পার্টিসিপেট করে। তাঁর আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয় না। আসলে শর্টকাট ওয়েতে বড়লোক হওয়ার কোনো সুযোগ নেই এবং এই প্রচেষ্টা না করাই ভাল। আপনি যদি সেটা করে থাকেন তাহলে আলটিমেটলি আপনার নেটওয়ার্থ কমে যাবে। বা আপনি ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়বেন।

পাঁচ.
সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রিতা। দেখবেন, আমরা অনেকেই আছি, যারা কোনো একটা কাজ শুরু করতে গিয়ে চিন্তা করতে করতে অনেক সময় নিয়ে নিই। তারপর অনেকের সাথে শেয়ার করি, বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ করি, পরে কাজটা শুরু করা হয় না। ফলে যেটা এই জানুয়ারিতে শুরু করার কথা ছিল, দেখা গেল সেই কাজ শুরু করতে আপনার সামনের বছরের জানুয়ারি চলে এলো। এত সময় নেয়ার কোনো যৈক্তিক কারণ ছিল না। এই যে সিদ্ধান্ত গ্রহণের দীর্ঘসূত্রিতা এবং সিদ্ধান্ত নিতে না পারা, এগুলো আপনার ইনকাম স্ট্রিমকে নষ্ট করে। যে কাজ এখন শুরু করার কথা, এক বছর পরে শুরু করার কারণে আপনার জীবন থেকে একবছর চলে গেল এবং আপনি পিছিয়ে পড়লেন। অন্যের থেকে না, আপনি নিজের থেকে পিছিয়ে পড়লেন। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে আপনার সতর্ক হতে হবে, সিদ্ধান্ত দ্রুত নিতে হবে।

ছয়.
কাজ না করে অভিযোগকে প্রাধান্য দেয়া। দেখুন, আমাদের সংসারে‌, আশেপাশে অনেক মানুষ আছেন যারা সবকিছুর মধ্যে দোষ ত্রুটি খুঁজে। নিজে কাজ করতে পারছেন না বা কাজ শুরু করতে পারছেন না, বা শুরু করলেও সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে পারছেন না, সেখানে নিজের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ না করে, এই কারণে করতে পারিনি, ঐ কারণে হচ্ছে না, আমার কাছে পুঁজি নেই, আমার বাবা আমাকে হেল্প করছে না, আমার ভাই আমাকে টাকা দিচ্ছে না, এ ধরনের নানা অভিযোগ করে। যারা সফল হয়েছেন তাঁদের দিকে যদি দৃষ্টি দেন তাহলে দেখবেন যে, কারোর প্রতি তাঁদের অভিযোগ নেই। তাঁরা নিজেদের সর্বোচ্চটা দিয়ে কাজ করেন। এবং যেটুকু আছে, যে অবস্থায় আছেন, সেখান থেকে তাঁরা শুরু করেছেন। আপনিও তাই করুন। আপনার যে সামর্থ্য আছে, সেই সামর্থ্য দিয়ে আপনি শুরু করুন। যখন আপনি সামনে হাঁটা শুরু করবেন, দেখবেন অনেকেই আপনার সঙ্গী হচ্ছে। যে কোনো কিছু যোগান দেওয়ার জন্য দেখবেন তখন আর লোকের অভাব হচ্ছে না। আপনি ছোট কোনো কাজ শুরু করলেও দেখবেন যে, সেই কাজই একসময় বড় হচ্ছে এবং অন্যান্য অনেক কাজের পথ খুলে গেছে।

সাত.
খরচের সঠিক হিসাব না রাখা। দেখুন, আয়ের হিসাব খুব বেশি একটা না রাখলেও চলে কারণ আপনার অসংখ্য উৎস নেই আয় করার। কিন্তু সকালে বাসা থেকে বের হয়ে বাসায় ফিরে আসা পর্যন্ত দেখবেন অনেকগুলো খাতে আপনার টাকা খরচ হয়েছে। জাপানিজরা একটা কাজ করে। তাঁরা ছোট্ট একটা নোটবুক ব্যবহার করে এবং প্রত্যেকটা খরচ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে লিখে রাখে। খরচের হিসাব আপনাকে করতে হবে। কিন্তু এই হিসাব করে শুধু রেখে দিলে হবে না। সম্পূর্ণ খরচের রিভিউ আপনাকে করতে হবে। একসময় মোট খরচ দেখার পর আপনার মনে হবে, অনেকগুলো খরচ আপনি না করলেও পারতেন কিন্তু আপনি করেছেন। আপনার যে ভুল খরচগুলো হয়েছে, সেগুলো পরবর্তীতে যেন না হয় সেদিকে খেয়াল করতে হবে। কারণ আপনার আয় তো আনলিমিটেড না। ফলে আপনি খরচও আনলিমিটেড করতে পারবেন না। যারা ভুল খরচ করেন, তাঁরা দুর্দশায় পড়েন, ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। আর যারা খরচে ভুল করেন না তাঁরা আস্তে আস্তে আর্থিকভাবে সফল হতে থাকেন।

আট.
সঙ্গী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে অসতর্কতা। এখানে সঙ্গী বলতে শুধু স্পাউস বাছাইয়ের কথা বলিনি। এর পাশাপাশি বন্ধুবান্ধব, যাদের সাথে আপনি চলেন, তাঁদের কথা বলছি। মূলত, আপনি যাদের সাথে চলেন, দেখবেন আপনার কাজকর্ম তাঁদের মত হচ্ছে। আপনি যদি অপব্যয়ী কারও সাথে চলেন, দেখবেন আপনিও তাঁদের মত অপব্যয়ী হচ্ছেন। তাঁদের যে অভ্যাস আপনার মধ্যে চলে আসছে। আপনি যদি মিতব্যয়ী লোকের সাথে চলেন, দেখবেন, আপনিও তাঁদের মত মিতব্যয়ী হচ্ছেন। আপনি যে স্পাউস নির্বাচন করেছেন, সে যদি অতি খরচ করে, দেখবেন আপনার অবস্থা খারাপ হচ্ছে। আপনার খুব সচেতন হওয়া দরকার আপনি কাদের সাথে চলাফেরা করছেন। তাঁরা কি সফল মানুষ? তাঁরা কি আপনাকে পজিটিভ দিকে উৎসাহিত করে নাকি আপনাকে খরচের দিকে উৎসাহিত করে। আপনার জন্য যেটা সঠিক, আপনার জন্য যেটা মঙ্গল, সেটাই আপনার করা উচিৎ।

নয়.
আয়ের সাথে ব্যয়ের সামঞ্জস্য করতে না পারা। এটি হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট। ধরুন, আপনার আয় ১০,০০০ টাকা কিন্তু আপনার ব্যয় হচ্ছে ১২০০০ টাকা। দেখে যাচ্ছে, প্রতি মাসে ২০০০ টাকা করে অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে। আপনার যদি জমা টাকা থাকে, তাহলে সঞ্চয় ভেঙে খরচ করা খুব আনওয়াইজ একটা সিদ্ধান্ত হবে। আপনার যা আয় তার থেকে আপনার কম খরচ করতে হবে। আয়ের সাথে আপনার ব্যয়ের একটা সামঞ্জস্য থাকতে হবে। ওয়ারেন বাফেট বলেছেন, আপনার খরচের পর যা থাকবে তা সঞ্চয় করবেন না বরং সঞ্চয়ের পর যা থাকবে তাই খরচ করবেন। যারা এটা করেন না এবং খরচের সঠিক পরিকল্পনা করেন না, তাঁরা আয় এবং ব্যয়ের সাথে সামঞ্জস্য রাখতে পারেন না। দেখবেন যে, অনেকের কাছে রিটায়েরমেণ্টের পরে পর্যাপ্ত টাকা থাকে। আবার অনেকের অনেক ঋণ থাকে। এটা মূলত আয়ের উপর নির্ভর করে না, এটা নির্ভর করে ব্যক্তির খরচের অভ্যাসের উপরে এবং ফান্ড ম্যানেজমেন্টের দক্ষতার উপর। আজকের এই পরামর্শগুলো নিয়ে আপনারা চিন্তা করুন এবং আপনাদের জীবনে প্রয়োগ করলে দেখবেন দারিদ্র্য থেকে আপনারা মুক্ত হচ্ছেন। যারা গরীব তাঁরা আর গরীব থাকছেন না, আস্তে আস্তে ওয়েলদি হয়ে উঠছেন, ধনী হয়ে উঠছেন।

লেখক: অর্থনীতি বিশ্লেষক, ফাইন্যান্স ও বিজনেস স্ট্রাটেজিস্ট; ইউটিউবার ও সিইও, ফিনপাওয়ার লিডারশিপ ইন্টারন্যাশনাল।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

Join Manab Kallyan

সর্বোচ্চ পঠিত