বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬, ৬ কার্তিক, ১৪৩৩

ব্যবসায়ীকে অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবি, চাকরিচ্যুত সেনাসদস্যসহ গ্রেফতার ৬

চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে এসআরবি সদস্য পরিচয়ে এক ব্যবসায়ীকে অপহরণ করে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবির ঘটনায় চাকরিচ্যুত সেনাসদস্যসহ ছয়জনকে গ্রেফতার করেছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও বাঁশখালী থানা পুলিশ।

অপহরণের চারদিন পর কক্সবাজারের টেকনাফের লেদা (আলীখালী) রোহিঙ্গা ক্যাম্প-২৫ সংলগ্ন এলাকা থেকে মোহাম্মদ এহছান ওরফে হাসান নামে ওই ব্যবসায়ীকে সুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে।

অপহরণে ব্যবহৃত একটি প্রাইভেটকার, পাঁচটি কালো রঙের এসআরবি লেখা কোটি, দুটি ভুয়া এসআরবি পরিচয়পত্র ও একটি হ্যান্ডকাফ জব্দ করেছে পুলিশ।

পুলিশ জানায়, গত ১৭ অক্টোবর রাত সাড়ে ৮টার দিকে বাঁশখালী উপজেলার পুঁইছড়ির প্রেমবাজারে ব্যবসায়ী এহছানের মালিকানাধীন মেসার্স আব্দুল্লাহ এন্টারপ্রাইজ নামের হার্ডওয়্যারের দোকানে কয়েকজন ব্যক্তি প্রবেশ করেন। তাদের পরনে ছিল কালো পোশাকের ওপর এসআরবি লেখা কোটি, মাথায় কালো ক্যাপ ও মুখে মাস্ক। তারা নিজেদের এসআরবি সদস্য পরিচয় দিয়ে ব্যবসায়ীর পরিচয় নিশ্চিত করেন।

একপর্যায়ে এহছানকে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে টেনেহিঁচড়ে দোকান থেকে বের করে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে নিয়ে যান তারা। পরে বিভিন্ন যানবাহনে স্থানান্তর করে তাকে কক্সবাজারের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়।

অপহরণের পর ওই দিন রাত ১১টা ৪০ মিনিট থেকে ব্যবসায়ীর স্ত্রী ও দোকানের ব্যবস্থাপকের মোবাইল ফোনে বিভিন্ন ভিওআইপি নম্বর থেকে কল করে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। টাকা না দিলে তাকে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়। এ ঘটনায় ব্যবসায়ীর যমজ ভাই মো. হোছাইমের এজাহারের ভিত্তিতে বাঁশখালী থানায় মামলা হয়।

জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলমের নির্দেশনায় অপহৃত ব্যবসায়ীকে উদ্ধার ও জড়িতদের শনাক্ত করতে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। সহকারী পুলিশ সুপার (আনোয়ারা সার্কেল) মাহমুদুল হাসান ও ডিবির ওসি মো. মাসুদ রানার নেতৃত্বে একাধিক দল তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালায়।

এর ধারাবাহিকতায় গত ২০ অক্টোবর কক্সবাজার সদর থানার বাস টার্মিনাল, বাংলাবাজার ও কোর্টবাজার এলাকা থেকে ছয়জনকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ২১ অক্টোবর ভোর ৪টার দিকে টেকনাফের লেদা (আলীখালী) রোহিঙ্গা ক্যাম্প-২৫ সংলগ্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে অপহৃত ব্যবসায়ীকে উদ্ধার করা হয়।

ব্যবসায়ী মোহাম্মদ এহছান ওরফে হাসান/ফাইল ছবি

ব্যবসায়ী মোহাম্মদ এহছান ওরফে হাসান/ফাইল ছবি

গ্রেফতার ব্যক্তিরা হলেন গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার সুমন মুন্সি, কক্সবাজারের কুতুবদিয়া উপজেলার মিজানুর রহমান, উখিয়ার জয়নাল উদ্দিন, চট্টগ্রামের বাঁশখালীর মো. আব্বাস উদ্দিন, টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্প-২৬ এর বাসিন্দা মো. ছলিম ওরফে সেলিম এবং কক্সবাজার সদর উপজেলার দেলোয়ার হোসেন। তাদের মধ্যে সুমন মুন্সি চাকরিচ্যুত সেনাসদস্য।

পুলিশের ভাষ্য, সুমন মুন্সি অতীতে উখিয়া এলাকায় এসআরবিতে কর্মরত ছিলেন। ওই সময় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কয়েকজনের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগে তিনি চাকরিচ্যুত হন এবং কারাভোগ করেন।

পরে ভুয়া এসআরবি পরিচয়ে একটি দল গড়ে তোলেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য পাওয়া গেছে। তার বিরুদ্ধে ভুয়া এসআরবি সদস্য পরিচয়ে অপরাধের ঘটনায় ১৩টি মামলার তথ্য রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আব্বাস উদ্দিন ও দেলোয়ার হোসেন বিভিন্ন স্থানে সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে সুমনকে তথ্য দিতেন। পরে সুমন ও তার সহযোগীরা ভুয়া এসআরবি পরিচয় ব্যবহার করে অপহরণ এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায়ের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

পুলিশ জানায়, সুমন মুন্সির বিরুদ্ধে ছিনতাই, দস্যুতা ও অস্ত্র আইনে ১৩টি মামলা রয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। জয়নাল উদ্দিন ওরফে জুনুর বিরুদ্ধে অপহরণ, চুরি ও ছিনতাইয়ের তিনটি মামলা এবং ছলিম ওরফে সেলিমের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে দুটি মামলা রয়েছে। আব্বাস উদ্দিনের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি মামলা রয়েছে।

চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) মো. রাসেল জানান, এ ঘটনায় গ্রেফতার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

এই খবরটি আপনার বন্ধুর সাথে শেয়ার করুন