চিকিৎসা সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতির জন্য পৃথক ও সুনির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রক কাঠামো প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচ্যাম)। বাংলাদেশে চিকিৎসা প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো, স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকার সহজ করা ও রোগীদের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে এ আহ্বান জানানো হয়।
বিষয়টি নিয়ে সোমবার (১৯ অক্টোবর) ‘আনলকিং দ্য পটেনশিয়াল অব মেডিকেল টেকনোলজি টু ইমপ্রুভ পেশেন্ট আউটকামস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনা হয়। এটি সঞ্চালনা করেন অ্যামচ্যাম বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক চৌধুরী কায়সার মোহাম্মদ রিয়াদ।
অনুষ্ঠানে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের প্রতিনিধি এবং চিকিৎসা প্রযুক্তি খাতের ব্যবসায়িক নেতারা অংশ নেন। এসময় চিকিৎসা সরঞ্জামের নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ করা, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অনুমোদন, মূল্য অনুমোদনে পূর্বানুমানযোগ্যতা, শুল্ক-কর যৌক্তিকীকরণ এবং মেরামতের জন্য যন্ত্রপাতি পুনঃরপ্তানির বিধান সহজ করাসহ পাঁচটি নীতিগত সুপারিশ তুলে ধরে অ্যামচ্যাম।
স্বাগত বক্তব্যে অ্যামচ্যাম বাংলাদেশের সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল বলেন, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারে সংগঠনটি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। অ্যামচ্যামের সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোর বিদ্যমান বিনিয়োগের পরিমাণ পাঁচ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি। আগামী পাঁচ বছরে আরও পাঁচ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে সহায়তা করার লক্ষ্য রয়েছে তাদের।
তিনি জানান, উদ্ভাবন, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং রোগীদের উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসা প্রযুক্তি খাত এ লক্ষ্য অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এসময় চিকিৎসা প্রযুক্তি পণ্যের ওপর শুল্ক কর কমানোসহ একাধিক সুপারিশ করে অ্যামচ্যাম। সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে- ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের (ডিজিডিএ) আওতায় চিকিৎসা সরঞ্জামের জন্য পৃথক নির্দেশিকা প্রণয়ন, নিবন্ধনের নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ, নথিপত্র যাচাইয়ের প্রক্রিয়া দ্রুত করা এবং সমান্তরালভাবে বিভিন্ন পর্যায়ের পর্যালোচনা সম্পন্ন করা। পাশাপাশি নির্ধারিত মার্কআপ নির্দেশিকা ও সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাটের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (এমআরপি) অনুমোদনে পূর্বানুমানযোগ্যতা নিশ্চিত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
এছাড়া চিকিৎসা সরঞ্জাম ও যন্ত্রাংশের ওপর শুল্ক-কর যৌক্তিকীকরণ এবং মেরামতের জন্য সরঞ্জাম পুনঃরপ্তানি ও খুচরা যন্ত্রাংশ আমদানির বিধান সহজ করার সুপারিশ করেছে সংগঠনটি।
দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ হিসেবে আন্তর্জাতিক মান ও উত্তম চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চিকিৎসা প্রযুক্তির জন্য পৃথক নিয়ন্ত্রক কাঠামো তৈরিতে ডিজিডিএ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের চিকিৎসা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে যৌথ কর্মশালা আয়োজনের প্রস্তাবও দেওয়া হয়।
গোলটেবিল আলোচনায় প্রধান অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত। তিনি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করা, রোগ প্রতিরোধ এবং বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে সরকারের অগ্রাধিকারের কথা তুলে ধরেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, স্বাস্থ্য খাতে প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকার রেকর্ড বাজেট বরাদ্দ এবং সাম্প্রতিক করসংক্রান্ত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। চিকিৎসা সরঞ্জামের নিবন্ধন ও অনুমোদনে বিলম্বের বিষয়টি স্বীকার করে তিনি প্রক্রিয়া দ্রুত করার উদ্যোগের কথা জানান।
তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা শুধু চিকিৎসা সরঞ্জাম বিক্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। যন্ত্রপাতির পুরো জীবনচক্রের ব্যয়, বিক্রয়-পরবর্তী সেবা, প্রযুক্তি হস্তান্তর, স্থানীয় উৎপাদন ও সংযোজন এবং বাংলাদেশি প্রকৌশলী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরির বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি। পাশাপাশি চিকিৎসা সরঞ্জামের ব্যবহার ও কার্যকারিতা বাড়াতে জাতীয় পর্যায়ে ই-হেলথ ব্যবস্থা এবং ডিজিটাল মনিটরিং ড্যাশবোর্ড চালুর পরিকল্পনার কথা জানান। উদ্ভাবনী অর্থায়নব্যবস্থা ও স্বচ্ছ ক্রয়প্রক্রিয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন প্রতিমন্ত্রী।
অন্তর্ভুক্তিমূলক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার বিষয়ে তিনি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) কার্যক্রমের আওতায় সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে প্রতিবন্ধী শিশুদের সহায়তায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
আলোচনায় ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো. আলমগীর হোসেন চিকিৎসা প্রযুক্তি খাতের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা উন্নয়নে অধিদপ্তরের অগ্রাধিকার ও সংস্কার উদ্যোগ তুলে ধরেন। তিনি নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ করা এবং আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর পরিদর্শন পুনরায় চালুর উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে অনুমোদন প্রক্রিয়ায় সময়ানুবর্তিতা, স্বচ্ছতা ও পূর্বানুমানযোগ্যতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন।
চিকিৎসা প্রযুক্তির বৈশ্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দেন মেডট্রনিক পিএলসির সাবেক চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং ইন্টেলের সাবেক চেয়ারম্যান ডা. ওমর ইশরাক। তিনি প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করা, মানসম্মত চিকিৎসাসেবার পরিধি বাড়ানো এবং রোগীদের চিকিৎসার ফলাফল উন্নত করার সুযোগ তুলে ধরেন।
আলোচনায় আরও বক্তব্য দেন মেডট্রনিক বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর মায়াঙ্ক ত্রিপাঠি, বেক্টন ডিকিনসনের বাংলাদেশ বিজনেস লিডার মির্জা শাজিব রায়হান এবং জিই হেলথকেয়ার বাংলাদেশের কান্ট্রি হেড ও পরিচালক মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান (রোমেল)। ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের কমার্শিয়াল কাউন্সেলর পল ফ্রস্টসহ দূতাবাসের অন্য কর্মকর্তারাও এতে অংশ নেন।
