বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬, ৬ কার্তিক, ১৪৩৩

বিদেশে বিপদে পড়লে বাংলাদেশির পাশে রাষ্ট্র কতটা থাকে?

বিদেশে বাংলাদেশি নাগরিকদের আইনি সুরক্ষা, ন্যায়বিচার ও কূটনৈতিক সহায়তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর, মালদ্বীপে বাংলাদেশিদের আটক ও দেশে ফেরত পাঠানোর অভিযোগ এবং মালদ্বীপের অভিবাসন বিভাগের বিরুদ্ধে এক বিদেশি নাগরিকের মামলা প্রত্যাহারের ঘটনা এই আলোচনাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, বিদেশে কোনো বাংলাদেশি বিপদে পড়লে তার পাশে রাষ্ট্র কতটা কার্যকরভাবে দাঁড়ায়?

মালদ্বীপে অভিবাসন বিভাগের বিরুদ্ধে বেআইনি আটক ও দেশত্যাগে বাধ্য করার প্রক্রিয়ায় আইনি অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে করা একটি মামলা সম্প্রতি প্রত্যাহার করা হয়েছে। মামলার বাদী কানাকপন তাউংনার অভিযোগ ছিল, তাকে দোভাষী ছাড়াই একটি নথিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়েছিল। পরে অভিবাসন বিভাগ তার বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপ প্রত্যাহার করে তাকে মুক্তি দেয়। এরপর তিনি মামলা প্রত্যাহারের আবেদন করেন।

তবে মামলা প্রত্যাহারকে আদালত অভিবাসন বিভাগের পদক্ষেপ বেআইনি ঘোষণার সমতুল্য মনে করার সুযোগ নেই। কিন্তু ঘটনাটি একটি বিষয় সামনে এনেছে বিদেশি কর্মীরা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আইনি প্রতীকার চাইতে পারছেন কি না, তা নিশ্চিত করা জরুরি।

মালদ্বীপে আটক ও দেশে ফেরত যাওয়া কয়েকজন বাংলাদেশির অভিযোগ, অভিযানের সময় একই স্থানে থাকা একাধিক ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। তাদের দাবি, স্থানীয় ভাষায় লেখা নথিতে স্বাক্ষর নেওয়ার সময় দোভাষী ছিলেন না। কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, আইনজীবীর সহায়তা নেওয়া কিংবা নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরার পর্যাপ্ত সুযোগ না দিয়েই তাদের দেশে পাঠানো হয়েছে।

এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে জানতে হবে, আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ কী ছিল, কতজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে এবং বহিষ্কারের আগে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল কি না।

সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনাও একই ধরনের প্রশ্ন সামনে এনেছে। তাদের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ ছিল, বিচার ও আপিলের সুযোগ কীভাবে দেওয়া হয়েছিল এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশ দূতাবাস কী ধরনের সহায়তা দিয়েছিল এসব বিষয়ে স্বচ্ছ তথ্য থাকা প্রয়োজন।

অন্য দেশের বিচারব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করা দূতাবাসের কাজ নয়। তবে আটক নাগরিকের খোঁজ নেওয়া, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগে সহায়তা করা, আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগের পথ দেখানো এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে প্রয়োজনীয় যোগাযোগ রাখা দূতাবাস ও হাইকমিশনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

দুঃখজনকভাবে, প্রবাসীদের অভিযোগের জবাব পেতে অনেক সময় দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়। এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে যোগাযোগ, আজ-কাল-পরশু করতে করতে অনেক প্রশ্নের উত্তর আর পাওয়া যায় না। অথচ আটক, বহিষ্কার কিংবা মৃত্যুদণ্ডের মতো ঘটনায় সময়ের গুরুত্ব অনেক বেশি।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট দূতাবাসগুলোর উচিত এসব ঘটনায় কী ধরনের সহায়তা দেওয়া হয়েছে, তা স্পষ্ট করা। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও আইনি সীমাবদ্ধতা বজায় রেখেও প্রয়োজনীয় তথ্য জানানো সম্ভব।

প্রবাসীরা শুধু রেমিট্যান্স পাঠানোর মাধ্যম নন। তারা বাংলাদেশের নাগরিক। বিদেশে তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে আইন অনুযায়ী বিচার হবে, কিন্তু অভিযোগ আর অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। প্রত্যেকের আইনি অধিকার ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

বিদেশে বিপদে পড়লে একজন বাংলাদেশি রাষ্ট্রের কাছ থেকে কতটা সহায়তা পান এই প্রশ্নের উত্তর কথায় নয়, কার্যকর উদ্যোগ ও স্বচ্ছতার মাধ্যমে দিতে হবে। প্রবাসীদের অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষায় রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল আনুষ্ঠানিক যোগাযোগে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না।

এই খবরটি আপনার বন্ধুর সাথে শেয়ার করুন