জাতীয় সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা, জাতীয় মর্যাদা, নিরাপত্তা ও জনগণের কল্যাণ সুরক্ষার পাশাপাশি জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির আলোকে পরিচালিত হওয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে সার্বভৌম সমতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সুবিধার ভিত্তিতে গঠনমূলক সম্পর্ক এগিয়ে নিতে হবে। জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার অর্থ বন্ধুত্ব ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সঙ্গে আপস করা নয়।
সোমবার (২ নভেম্বর) বঙ্গভবনে ন্যাশনাল ডিফেন্স কোর্স-২০২৬ এবং আর্মড ফোর্সেস ওয়ার কোর্স-২০২৬-এর সদস্যদের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে এ কথা বলেন রাষ্ট্রপতি।
রাষ্ট্রপতি বলেন, বাংলাদেশ শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, জাতিগুলোর মধ্যে বন্ধুত্ব এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে গঠনমূলক সম্পৃক্ততায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির আলোকে সব দেশের সঙ্গে পারস্পরিক সুবিধাজনক সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে চায় বাংলাদেশ।
ভবিষ্যতের কৌশলগত নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সংঘাতের পরিবর্তে সহযোগিতা, মতবিরোধের পরিবর্তে সংলাপ এবং সংঘর্ষের পরিবর্তে শান্তির প্রতি আমাদের অভিন্ন অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করতে হবে। এর মধ্য দিয়ে আরও নিরাপদ, স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ বিশ্ব গড়ে তোলা সম্ভব।
বিশ্বের পরিবর্তিত নিরাপত্তা পরিস্থিতি তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রচলিত নিরাপত্তা উদ্বেগের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন, সাইবার হুমকি, আন্তদেশীয় অপরাধ, সন্ত্রাসবাদ, মহামারি, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, পরিবর্তনশীল প্রযুক্তি এবং অন্যান্য নতুন চ্যালেঞ্জ সামনে আসছে।
জাতীয় নিরাপত্তাকে এখন আর শুধু সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার সুযোগ নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর সঙ্গে অর্থনৈতিক সক্ষমতা, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা, পরিবেশগত স্থায়িত্ব, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিও জড়িত।
তিনি বলেন, বৈশ্বিক ক্ষমতার পরিবর্তন, কৌশলগত প্রতিযোগিতা ও আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। বঙ্গোপসাগর ও বৃহত্তর ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থানের কারণে সতর্কতা ও দূরদর্শিতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা ও উন্নত ডিজিটাল প্রযুক্তি যুদ্ধ ও নিরাপত্তাব্যবস্থাকে পরিবর্তন করছে উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, ভুল তথ্য, অপতথ্য ও সাইবার হুমকি জাতীয় নিরাপত্তা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এসব মোকাবিলায় প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি, ডিজিটাল সাক্ষরতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা প্রয়োজন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় প্রচলিত চিন্তার সীমা অতিক্রম করতে সক্ষম নেতৃত্ব প্রয়োজন। এ জন্য কৌশলগত দূরদর্শিতা, বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ, বুদ্ধিবৃত্তিক উদারতা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও দেশের মধ্যে একসঙ্গে কাজ করার সক্ষমতা থাকতে হবে।
ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের ভূমিকার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, সশস্ত্র বাহিনী, বেসামরিক প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা এবং বন্ধুরাষ্ট্রগুলোর জ্যেষ্ঠ নেতাদের একত্র করার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি ধারণা বিনিময়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জটিল বিষয় পর্যালোচনা এবং সমসাময়িক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে অভিন্ন উপলব্ধি তৈরির অনন্য পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।
কোর্সে অংশগ্রহণকারীদের উদ্দেশে রাষ্ট্রপতি বলেন, এই প্রতিষ্ঠানে অর্জিত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের দায়িত্ব কোর্স শেষ হওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অর্জিত জ্ঞান, দৃষ্টিভঙ্গি ও পেশাগত সম্পর্ক তাদের কর্মজীবনে পথনির্দেশনা ও সহায়তা দেবে।
বাংলাদেশের কোর্স সদস্যদের উদ্দেশে তিনি বলেন, সবকিছুর ঊর্ধ্বে দেশ ও জনগণের স্বার্থকে স্থান দিতে হবে। কর্মস্থল যেখানেই হোক, পেশাদারত্ব, সততা, শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি বজায় রাখতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক সীমারেখা অতিক্রম করে কাজ করা, নতুন চ্যালেঞ্জ কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা এবং কৌশলগত পরিকল্পনাকে অর্থবহ কাজে রূপ দেওয়ার সক্ষমতাসম্পন্ন নেতাদের ওপর দেশের ভবিষ্যৎ ক্রমেই নির্ভর করবে।
রাষ্ট্রপতি বলেন, বাংলাদেশ বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে আরও সমৃদ্ধ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সহনশীল রাষ্ট্র গড়ার যাত্রা অব্যাহত রাখতে হবে। এ যাত্রায় নেতৃত্বের গুণগত মান, প্রতিষ্ঠানের শক্তি এবং জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ থাকার সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বন্ধুরাষ্ট্রগুলোর কোর্স সদস্যদের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, তাদের অংশগ্রহণ ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মাত্রা যুক্ত করেছে। বাংলাদেশে তাদের অবস্থান পেশাগত শিক্ষা অর্জনের পাশাপাশি এ দেশের মানুষ, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আকাঙ্ক্ষা সম্পর্কে জানার সুযোগ করে দিয়েছে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, এখানে গড়ে ওঠা বন্ধুত্ব মূল্যবান সম্পদ। তারা বাংলাদেশের সুন্দর স্মৃতি সঙ্গে নিয়ে যাবেন এবং নিজ নিজ দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করবেন বলে তিনি আশা করেন।
ভাষণের শুরুতে রাষ্ট্রপতি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। তিনি বলেন, তাদের সাহস, আত্মত্যাগ ও অবিচল অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে। শান্তিপূর্ণ, গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গঠনে মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ পথ দেখাতে হবে।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তমের প্রতিও গভীর শ্রদ্ধা জানান রাষ্ট্রপতি। মহান মুক্তিযুদ্ধে, বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার ক্ষেত্রে তার অবদানের কথা উল্লেখ করেন তিনি। ১৯৭৭ সালে ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজ প্রতিষ্ঠাসহ পেশাদার সামরিক শিক্ষা বিস্তারেও তার অবদান উল্লেখযোগ্য বলে মন্তব্য করেন।
এ ছাড়া ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলিতে জীবন উৎসর্গকারীদের এবং গত ১৭ বছর ধরে গণতন্ত্রের জন্য দীর্ঘ সংগ্রামে প্রাণ দেওয়া ব্যক্তিদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন রাষ্ট্রপতি। তাদের আত্মত্যাগ ও দুর্ভোগ জনগণের মর্যাদা রক্ষা, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত এবং সর্বোপরি গণতন্ত্রকে সমুন্নত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার সম্মিলিত দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
দেশের সেবায় আত্মত্যাগকারী সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের প্রতিও শ্রদ্ধা জানান তিনি। মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন এবং দেশের অভ্যন্তরে শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় তাদের সাহস ও কর্তব্যনিষ্ঠাকে জাতীয় গর্বের স্থায়ী উৎস হিসেবে উল্লেখ করেন।
ভাষণের শেষ পর্যায়ে ন্যাশনাল ডিফেন্স কোর্স-২০২৬ ও আর্মড ফোর্সেস ওয়ার কোর্স-২০২৬-এর সব সদস্যকে অভিনন্দন জানান রাষ্ট্রপতি। ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের কমান্ড্যান্ট, শিক্ষক ও কর্মীদেরও সক্ষম ও দূরদর্শী নেতৃত্ব গড়ে তোলার কাজে তাদের নিষ্ঠার জন্য প্রশংসা করেন। প্রতিষ্ঠানটির অব্যাহত সাফল্য এবং কোর্সে অংশগ্রহণকারীদের ভবিষ্যৎ দায়িত্ব পালনে সাফল্য কামনা করেন তিনি।






















