শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬, ৬ ভাদ্র, ১৪৩৩

ঢাবির ছাত্রী হলে সান্ধ্য আইন বাতিল-কারফিউ শিথিলের দাবি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ছাত্রী হলের প্রবেশ সংক্রান্ত ‘সান্ধ্য আইন’ সম্পূর্ণ বাতিল এবং কারফিউ শিথিলের প্রস্তাব প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে নারী শিক্ষার্থীদের প্ল্যাটফর্ম ‘অবরোধবাসিনী’। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির পক্ষ থেকে এসব দাবি জানানো হয়।

সংবাদ সম্মেলনে ‘অবরোধবাসিনী’ জানায়, গত ৩০ জুলাই থেকে তারা তিন দফা দাবিতে ধারাবাহিক আন্দোলন করে আসছে। এর অংশ হিসেবে ছাত্রী হলগুলোতে গ্রাফিতি, পোস্টারিং, মোমবাতি মিছিলের পাশাপাশি একাডেমিক এরিয়ায় নারী শিক্ষার্থীদের গণস্বাক্ষর ও ভোগান্তির গল্প সংগ্রহ করা হয়েছে। পরে ৯ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কাছে ১২০০-এর বেশি নারী শিক্ষার্থীর স্বাক্ষর ও স্মারকলিপি জমা দিয়ে ১০ আগস্টের সংহতি সমাবেশ থেকে সান্ধ্য আইন বাতিলের দাবিতে প্রশাসনকে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেওয়া হয়।

তবে, প্রশাসনের পক্ষ থেকে তিন দফা দাবির পরিবর্তে কারফিউ শিথিল করে এক ঘণ্টা বাড়ানোর একটি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলে জানায় সংগঠনটি। ‘অবরোধবাসিনী’র দাবি, নারী শিক্ষার্থীদের নাগরিক ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার পরিবর্তে এ ধরনের সীমিত প্রস্তাব সমস্যার সমাধান নয়।

সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়, প্রশাসনের কাছে পুরুষ শিক্ষার্থীদের জন্য ২৪ ঘণ্টা মুক্ত চলাচলের সুযোগ থাকলেও নারী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার নামে নির্দিষ্ট সময়ের পর চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হচ্ছে। তাদের অভিযোগ, এই নীতির কারণে রাতের বেলায় বাইরে থেকে ফেরা নারী শিক্ষার্থীরা নানা প্রশাসনিক জটিলতা ও হয়রানির মুখোমুখি হন।

সংগঠনটি দাবি করে, নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের। শিক্ষার্থীদের চলাচল সীমিত করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা স্থায়ী সমাধান নয়। বরং ক্যাম্পাস ও হলের গেটে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা জোরদার এবং প্রহরী ও নিরাপত্তাকর্মীদের দায়িত্বশীল ভূমিকা নিশ্চিত করার দাবি জানায় তারা।

সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, সান্ধ্য আইন শুধু হলের গেটের বিধিনিষেধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব নারী শিক্ষার্থীদের একাডেমিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও পেশাগত কার্যক্রমেও পড়ছে। সংগঠনটির দাবি, রাত ১০টার পর হলের বাইরে থাকলে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় নারী শিক্ষার্থীদের। বিশেষ করে টিউশন, সাংবাদিকতা, একাডেমিক বা সাংগঠনিক কাজ এবং জরুরি প্রয়োজনে বাইরে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য এ বিধিনিষেধ ভোগান্তির কারণ হচ্ছে।

‘অবরোধবাসিনী’ সংগঠন আরও অভিযোগ করে, নারী শিক্ষার্থীদের জন্য হলের গেটে সময়সীমা নির্ধারণের পাশাপাশি অনাবাসিক ছাত্রীদের হলের ক্যানটিন ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বাধা রয়েছে। তাদের দাবি, অনাবাসিক নারী শিক্ষার্থীদের অনেকেই নিয়মিত ফি পরিশোধ করলেও নিজেদের হলের সুবিধা ব্যবহারে সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হন।

নিরাপত্তার নামে বৈষম্য নয়

সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়, নিরাপত্তার অজুহাতে নারী শিক্ষার্থীদের চলাচল সীমিত না করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে ক্যাম্পাসের সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। তাদের দাবি, ছাত্রী হলের গেটে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রহরী ও নিরাপত্তাকর্মীদের নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সব শিক্ষার্থীর সঙ্গে সমান ও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।

‘পুরো ঢাকা শহর বা রাতের সব জায়গার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়’-প্রশাসনের এমন যুক্তির প্রসঙ্গ তুলে ধরে সংগঠনটি। তাদের বক্তব্য, পুরো শহরের নিরাপত্তার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নয়; তবে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ভেতরে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রশাসনের প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব।

তিন দফা দাবি পুনর্ব্যক্ত

সংবাদ সম্মেলনে ‘অবরোধবাসিনী’ তাদের তিন দফা দাবি পুনর্ব্যক্ত করে। দাবিগুলো হলো-

১. ছাত্রী হলের ‘সান্ধ্য আইন’ সম্পূর্ণ বাতিল করে নারী শিক্ষার্থীদের ২৪ ঘণ্টা নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা।

২. বৈধ পরিচয়পত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে আবাসিক ও অনাবাসিক সব নারী শিক্ষার্থীকে যে কোনো ছাত্রী হলে প্রবেশ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অবস্থানের সুযোগ দেওয়া।

৩. মা-বোনসহ নারী শিক্ষার্থীদের নারী স্বজনদের ছাত্রী হলে প্রবেশের সুযোগ নিশ্চিত করা।

এর আগে, ৩ আগস্ট সংবাদ সম্মেলনে এই তিন দফা দাবি জানিয়েছিল ‘অবরোধবাসিনী’। পরে ১০ আগস্ট সংগঠনটি প্রশাসনকে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেয়।

সংবাদ সম্মেলনে ‘অবরোধবাসিনী’ জানায়, তাদের দাবি কোনো আংশিক বা সাময়িক শিথিলতা নয়; তারা বৈষম্যমূলক সান্ধ্য আইন সম্পূর্ণ বাতিল এবং নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ও স্বাধীন চলাচল নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছে।

সংগঠনটি আরও জানায়, দাবি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত তাদের কর্মসূচি চলবে। একই সঙ্গে তারা প্রশাসনের প্রতি কারফিউ শিথিলের প্রস্তাব প্রত্যাহার করে নারী শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো নিয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

এই খবরটি আপনার বন্ধুর সাথে শেয়ার করুন
Join Manab Kallyan